You are here
Home > Blog > রোগ নিরাময়কারী পোশাক ‘আয়ুর্বস্ত্র (Ayurvastra)’- আয়ুর্বেদিক বা হারবাল ট্যাক্সটাইল

রোগ নিরাময়কারী পোশাক ‘আয়ুর্বস্ত্র (Ayurvastra)’- আয়ুর্বেদিক বা হারবাল ট্যাক্সটাইল

আমরা জানি যে, আমাদের ত্বক দেহের সুরক্ষায় ব্রহ্মাস্ত্রের  মতো কাজ করে, শরীরের ভেতরে বিষাক্ত জীবাণু প্রবেশ বাঁধা দেয়, আবার ত্বকের লোমকূপের মাধ্যমে ঘাম হয়ে শরীরের অভ্যন্তরীণ জীবাণুও বেরিয়ে যায়। তবে শুধু তাই নয় ত্বক হতে পারে আমাদের দেহের অভ্যন্তরীণ ট্রিটমেন্টেরও গেইটওয়ে বা প্রবেশদ্বার। 

এর মানে কি আমরা এমন কিছু পরিধানও করতে পারি, যা ত্বকের মাধ্যমে আমাদের রোগ নিরাময়ে অবদান রাখতে পারে? 

হ্যাঁ, প্রাচীন চিকিৎসাশাস্ত্রের সাথে আধুনিক চিকিৎসা ব্যবস্থাও কিন্তু একমত পোষন করছে। এই আর্টিকেলে বিশদভাবে এ নিয়ে আলোচনা করা হবে।

পোশাক কে বলা যায় শরীরের দ্বিতীয় ত্বক। আমাদের সুস্থতার জন্য যেমন ভেজালহীন এবং ক্যামিকেল মুক্ত খাদ্যের প্রয়োজন, তেমনি প্রয়োজন অর্গানিক পোশাক বা ক্যামিকেল মুক্ত পোশাক। বিশ্ব ফ্যাশনের বিবর্তন, ফাস্ট ফ্যাশনের আবির্ভাব, নতুন সব ট্রেন্ডের আগমন যদিও মানুষকে কম মূল্যের কৃত্রিম ফেব্রিকে তৈরি পোশাকেই বেশি অভ্যস্ত করে ফেলেছে; তবে পরিবেশ এবং স্বাস্থ্যের সুরক্ষায় আবার মানুষের মাঝে কিঞ্চিৎ সচেতনতাও পুনরুজ্জীবিত হচ্ছে। এরই ফলস্বরূপ বাড়ছে বিভিন্ন ন্যাচারাল ডাই এবং ন্যাচারাল ফেব্রিকের ব্যবহার। এরই সাথে বস্ত্রশিল্পে আবির্ভাব হয়েছে এক নতুন নামের, যাকে বলা হয়- আয়ুর্বস্ত্র বা হারবাল ট্যাক্সটাইল। 

অবাক লাগছে, তাই না? 

আয়ুর্বেদিক এবং হারবাল, এই নাম দুটোর সাথে আমরা পরিচিত ভারতীয় চিকিৎসা শাস্ত্রের এক প্রাচীন শাখা হিশেবে। রূপচর্চায়ও এর বহুল ব্যবহার রয়েছে। তবে পোশাক শিল্পে এই হারবাল বা আয়ুর্বেদ শব্দের বা টেকনিকের ব্যবহারের সাথে আমরা খুব বেশি মানুষ কিন্তু পরিচিত নই। 

যদিও এটি প্রাচীন কাল থেকেই আয়ুর্বেদিক শাস্ত্রের একটি শাখা হিশেবে প্রচলিত ছিল, কিন্তু এই আধুনিক ফ্যাশনে আয়ুর্বস্ত্র বা হারবাল ট্যাক্সটাইল ঠিক ক’জন মানুষের দৃষ্টিগোচর হয়েছে, ক’জন মানুষ এর চর্চা করছে তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে। বিশেষ করে বাংলাদেশে আদৌ এর চর্চা শুরু হয়েছে বলে জানা যায় নি। 

ন্যাচারাল ডাই এর সাথে আমরা কম বেশি সবাই পরিচিত। ন্যাচারাল ডাই এর ফেব্রিকগুলো খুব সফট কালারের হয়, দীর্ঘস্থায়ী ও টেকসইও হয়। এমনকি অনেকদিন পরও এর সৌন্দর্য ম্লান হয় না। ন্যাচারাল সোর্সের এই ডায়িং প্রসেসে পরিবেশ দূষণের কোনো সম্ভাবনা নেই এবং এর থেকে প্রাপ্ত বর্জ্য আদর্শ সার হিশেবেও ব্যবহার করা যায়। বর্তমানে পরিবেশ সচেতনতার জন্য সারাবিশ্বেই তাই এর জনপ্রিয়তা বেড়েই চলেছে। 

ন্যাচারাল ডাই সবার কাছে বেশ পরিচিত এবং পুরোনো হলেও আয়ুর্বস্ত্র বা হারবাল ট্যাক্সটাইলের ধারণাটা দক্ষিণ ভারতীয়দের কাছে প্রাচীন হলেও এখনো সর্বসাধারণের কাছে একদমই নতুন একটি আইডিয়া। তবে এটি যে ট্যাক্সটাইল ইন্ডাস্ট্রিতে নতুন মাত্রা যুগ করছে এতে কোনো সন্দেহ নেই। এখন মানুষ নিজেদের সুস্থতার জন্য ও রোগ নিরাময়ের জন্য পরতে উৎসাহী হবে এই আয়ুর্বস্ত্র। 

কী এই আয়ুর্বস্ত্র (Ayurvastra) বা হারবাল ট্যাক্সটাইল?

সংস্কৃত শব্দ ‘Ayur’ মানে জীবন, কেউ কেউ আবার এর অর্থ স্বাস্থ্যও বলে থাকে এবং ”Vastra’ মানে পোশাক। অর্থাৎ আয়ুর্বস্ত্র মানে বলতে পারি আমরা ‘স্বাস্থ্যকর পোশাক’। 

এই আয়ুর্বস্ত্র আয়ুর্বেদিক শাস্ত্রের একটি শাখা হিশেবে বহু প্রাচীনকাল থেকেই, বলা হয় প্রায় ৫০০০ বছর ধরে প্রচলিত ভারতের বৈদিক স্বাস্থ্য চর্চায়। সম্পূর্ণ হ্যান্ডলুম তাঁতশিল্পে এর প্রচলন এখনো বর্তমান ভারতে। নতুন করে তারা এর জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি করতে চাচ্ছে মানুষকে এই সম্পর্কে সচেতন করার মাধ্যমে। আয়ুর্বস্ত্র হয় ১০০ ভাগ আর্টিফিশিয়াল ফাইবার এবং ক্যামিকেল ফ্রি বস্ত্র, যা পরিবেশ বান্ধব এবং মানুষের শরীর ও ত্বকের জন্য অনেক বেশি উপকারি, এমনকি অনেক রোগের নিরাময়কারী হিশেবেও এর কার্যকারিতা রয়েছে। 

আয়ুর্বস্ত্র তৈরিতে সার্টিফাইড অর্গানিক কটন, পাট, ন্যাচারাল সিল্ক ইত্যাদি বিভিন্ন ন্যাচারাল ফেব্রিককে হলুদ, দারচিনি, নিম, তুঁত ইত্যাদি সহ বিভিন্ন মেডিসিনাল হার্ব ও প্ল্যান্ট এর নির্যাসে ডায়িং বা রং করা হয়। 

প্রাচীনকাল থেকেই দক্ষিণ ভারতের রাজ পরিবারের সদস্যরা তাদের সুস্থতা এবং চিকিৎসার জন্য আয়ুর্বস্ত্রের ব্যবহার করে আসছে। আমাদের ত্বক যখন এ ধরণের ভেষজ পোশাকের সংস্পর্শে আসে তখন এটি ত্বকের ট্রিটমেন্ট গেইটওয়ে হিশেবে কাজ করে এবং ডায়াবেটিস, ত্বকের এলার্জিক সংক্রমণ, হাঁপানি, আর্থ্রাইটিস এবং উচ্চ রক্তচাপ ইত্যাদির মতো আরও অসংখ্য  রোগ প্রতিরোধ ও নিরাময়ে সাহায্য করে। এছাড়াও আয়ুর্বস্ত্র শরীরের অভ্যন্তরীণ মেটাবলিজমের ব্যালেন্স করে এবং ইমিউন সিস্টেম শক্তিশালী করে তোলে। 

হারবাল ট্যাক্সটাইল ডায়িং এবং ভেজিটেবল ডায়িং এর পার্থক্য কী? 

ট্যাক্সটাইল ফেব্রিক যখন ভেষজ গুণ সম্পন্ন প্ল্যান্ট এবং হার্ব থেকে প্রাপ্ত নির্যাসে ডায়িং করা হয়, তখন সেটাকে হারবাল ট্যাক্সটাইল বলে। এই প্রক্রিয়ায় কোনো ধরনের রাসায়নিকের ব্যবহার করা হয় না। 

তবে সাধারণ ভেজিটেবল ডায়িং এর ক্ষেত্রে কিছু রাসায়নিক দ্রব্য যেমন – কপার সালফেট এবং ফেরাস সালফেট ক্যাটালিস্ট বা অনুঘটক হিশেবে ব্যবহার করা হয়। এজন্যই ভেজিটেবল ডায়িং থেকে হারবাল ডায়িং এর ট্যাক্সটাইল আলাদা এতে ক্ষতিকর রাসায়নিক বিহীন বাড়তি ঔষধি গুণাবলী থাকার কারণে৷ 

হারবাল ট্যাক্সটাইলের রং যে সব প্ল্যান্ট সোর্স থেকে নেয়া হয়, এগুলো শুধু ন্যাচারালই না বরং ঔষধি গুণসম্পন্নও। এগুলো পুরো ভেষজ উপায়েই প্রসেস করা হয় কোনো ক্যামিকেলের সংস্পর্শ ছাড়া। কাপড়ের ব্লিচিংও প্রাকৃতিকভাবে সূর্যের আলোর সংস্পর্শে এসে করা হয়। তাই এদের ভেষজ বা ঔষধি গুণ পোশাকে পুরোপুরি বজায় থাকে৷ 

হার্ব বা ভেষজ বলতে কী বোঝায়? 

আঁশজাতীয়, সুগন্ধযুক্ত, ঔষধিগুণ সম্পন্ন কিছু উদ্ভিদ বা উদ্ভিজ্জ উপাদানকে হার্ব বা ভেষজ বলা হয়। এগুলো সাধারণত রন্ধনশিল্পে মসলা হিশেবে বা সুগন্ধী হিশেবে বা অসুস্থতায় ঘরোয়া চিকিৎসা হিশেবে ব্যবহার হয়ে থাকে৷ 

বিভিন্ন হার্বের উপকারিতা ও কার্যকারিতা বিভিন্ন। তাই ভেষজ বা  হারবাল ট্যাক্সটাইল আমাদের সুস্বাস্থ্যের জন্য  অনেক সুফল বয়ে আনে এবং উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ, হাঁপানি এবং ডায়াবেটিসের মতো রোগের বিরুদ্ধে লড়াই করতে পারে।  ইন্ডিগো বা নীলের নির্যাসে রঞ্জিত আয়ুর্বস্ত্র ইতিমধ্যেই রোগ নিরাময়ে ভূমিকা রাখছে বলে প্রমাণিত;  হলুদ ব্যথা নিরাময় করতে পারে এবং ত্বক ভালো রাখতে সাহায্য করে;  এবং চন্দন আমাদের স্ট্রেস নিরোধক হিশেবে কাজ করে।  এছাড়াও আরও কিছু ভেষজ রং এর সোর্স হলো- ডালিম, তেঁতুল, মদ্দার, ক্যাস্টর অয়েল, তুলসী, বুনো হলুদ, মেহেদি, কারি পাতা, ঘৃতকুমারী এবং আরও কিছু ভেষজ ফল। 

ট্যাক্সটাইলের জন্য প্রাকৃতিক রং এর উৎসই হলো ছোট বড় বিভিন্ন উদ্ভিদ এবং ভেষজ উদ্ভিদের পাতা, শেকড়, কান্ড, ফল, বীজ ইত্যাদি বিভিন্ন অংশ। 

ট্যাক্সটাইল শিল্পে ব্যবহৃত কিছু হার্ব বা ভেষজ উপাদান নিম্নরূপঃ

হলুদ (Turmeric):

হলুদ এবং আদা একই গোত্রীয় উদ্ভিদ। আমাদের দেশে হলুদ রান্নাবান্নায় রং, স্বাদ ও সুগন্ধ সবকিছুর জন্যই ব্যবহৃত হয়৷ উপমহাদেশীয় রান্নার অবিচ্ছেদ্য অংশই বলা যায় একে। আবার রূপচর্চায়ও হলুদের ব্যবহার হয়ে আসছে যুগ যুগ ধরে। রান্নার মসলা হিশেবে ব্যবহার ছাড়াও হলুদের বহুবিদ ব্যবহার রয়েছে, যার মধ্যে অন্যতম হলো- সুতা বা কাপড় কে রঙিন করতে, কাপড়ের উপর পেইন্টিং, প্রিন্টিং ইত্যাদি করতেও হলুদের ব্যবহার করা হয় ব্যাপক পরিসরে। 

নীল বৃক্ষ (Indigo):

সর্বাধিক ব্যবহৃত ট্যাক্সটাইল ডায়িং প্ল্যান্ট বলা যায় একে। বাণিজ্যিকভাবে যে নীল পাউডারটি আমরা দেখতে পাই তা এই জাতের ইন্ডিগোফেরা টিনক্টোরিয়ার পাতা থেকে তৈরি করা হয়। এ ধরণের নীল বৃক্ষের উপযোগী জায়গা হয় গরম, আদ্র এবং রৌদ্রজ্বল। 

লতাজাতীয় উদ্ভিদ (Madder):

মাটিতে বিস্তৃত ছোট ছোট হলুদ ফুল এবং পাতা যুক্ত এই লতাগুল্মকে দেখতে যদিও আহামরি কিছু মনে হবে না, কিন্তু এরই মাঝে লুকায়িত আছে প্রকৃতির অপার রহস্য। এর শেকড়গুলোতে অ্যালিজারিন যুক্ত থাকায় ডায়িং এর সবচেয়ে মূল্যবান টকটকে লাল রং পাওয়া যায় এই শেকড় থেকে। 

পিঁয়াজ (Onion):

আমাদের রান্না এবং খাওয়ায় সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত মসলা এটি এবং এর খোসা হলো সবচেয়ে সস্তা কিন্তু অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ডায়িং উপাদান। পিঁয়াজের খোসা থেকে বেশ কয়েকটি রং তৈরি করা যায়। কমলা, হলুদ, মরিচা ও বাদামি রং এর অনেকগুলো শেড তৈরি করা যায় এই পিঁয়াজের খোসা থেকে। 

Manjistha / মঞ্জিষ্ঠা (লতানো উদ্ভিদ):

মঞ্জিষ্ঠার শেকড় থেকে লালচে একটা রং পাওয়া যায়। এর ভেষজ গুণ শরীরের রক্ত পরিশোধকের কাজ করে, ডোপামিন হরমোন নিঃসরণ বৃদ্ধি করে উদ্বিগ্নতা, হতাশা, মুড সুয়িং দূর করে, হাইপারটেনশন দূর করে, শরীরে ব্যাকটেরিয়া ও অন্যান্য জীবাণু প্রবেশে বাঁধা দেয় ইত্যাদি আরও অনেক গুণাগুণ এর রয়েছে। 

চন্দন (Sandalwood):

সুগন্ধীযুক্ত চন্দন কাঠের ভারী হলুদ রং এর সূক্ষ্ম গুড়ো বিভিন্ন রূপচর্চায়, প্রসাধন সামগ্রী, পারফিউম ইত্যাদিতে ব্যবহারের জন্য অনেক বেশি জনপ্রিয়। এই কাঠ সাধারণ কোনো কাঠ নয়, এর সুগন্ধ ১০বছর পর্যন্তও স্থায়ী হয়। এর থেকে লাল, গোলাপি, কপার, ব্রাউন কালার এবং এদের বিভিন্ন শেডের রং তৈরি করা যায়, যা হারবাল ট্যাক্সটাইল ডায়িং এর জন্য ব্যবহার করা হয় এবং চন্দনের ডায়িং এর কারণে পোশাকে শীতল অনুভূতি পাওয়া যায়। 

নিম (Neem):

নিম দ্বারা ডায়িং করা কাপড় ত্বকের বিভিন্ন সমস্যার নিরাময় করে, ব্যাকটেরিয়া ও জীবাণু প্রতিরোধ করে। 

ডালিম (Pomegranate):

রসালো ডালিম ফল একটি গেরুয়া-হলুদ রঞ্জক উৎপন্ন করে। এটিও হারবাল ডায়িং এ ব্যবহৃত হয়। 

Ramacham Plant: 

এটিও আয়ুর্বেদ বা হারবাল পোশাক ডায়িং এ ব্যবহৃত হয়। এতে ডায়িং করা পোশাক হাঁপানি দূর করে বলে জানা যায়। আয়ুর্বেদে এটি শীতল বৈশিষ্ট্যের জন্য বিখ্যাত, যা জ্বর এবং ত্বকের বিভিন্ন সমস্যার সমাধান হিশেবে ব্যবহার হয়। 

এছাড়াও তুলসি, অ্যালোভেরা, মেহেদি পাতা সহ এমন অসংখ্য হার্ব বা ভেষজ গুণ সম্পন্ন প্ল্যান্ট রয়েছে, যা আয়ুর্বস্ত্র ডায়িং এর জন্য ব্যবহার করা হয়। 

আয়ুর্বস্ত্র বা হারবাল ট্যাক্সটাইলের সম্ভাবনা:

পরিবেশ এবং স্বাস্থ্য সচেতনা বৃদ্ধির কারণে বিশ্বব্যাপী বিভিন্ন দেশে ক্যামিকেল ডায়িং এ বিভিন্ন নিষেধাজ্ঞা আরূপ করা হচ্ছে। এরই সূত্র ধরে বাড়ছে ভেষজ বা ঔষধি উদ্ভিদ থেকে প্রাপ্ত রং এর চাহিদা এবং ব্যবহার। ভেষজ উপাদানের নির্যাসের ন্যাচারাল ডায়িং এ কোনো ক্যামিকেলের ব্যবহার হয় না, ক্যামিকেল রিএকশনও হয় না বলা যায়, নবায়নযোগ্য উৎস থেকে উপাদানগুলো সংগ্রহ করা যায় এবং এই রং এ রঞ্জিত ফেব্রিক বায়োডিগ্রেডেবল এবং রোগ নিরাময়কারী বৈশিষ্ট্যের অধিকারী হয়। এই ধরনের টেক্সটাইলগুলি 100% নিরাপদ এবং 100% রাসায়নিক মুক্ত হয়। এসব কারণেই এখন ধীরে ধীরে বড় হচ্ছে আয়ুর্বস্ত্রের বাজার। 

হারবাল ট্যাক্সটাইল বা আয়ুর্বস্ত্র পরিবেশ বান্ধব হওয়ার অন্যতম আরেকটি কারণ হলো- এগুলো বস্ত্র তৈরিতে প্রধানত অর্গানিক কটন ফেব্রিক ব্যবহৃত হয়। অর্গানিক কটন বলতে বোঝায়, যে কটন বা তুলা চাষ করার সময় কোনো ধরনের ক্যামিকেল বা সার ব্যবহার করা হয় নি, সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক ভাবে, প্রাকৃতিক সারের ব্যবহার করে তুলা উৎপাদন করা হয়েছে। এই অর্গানিক কটন ১০০% পরিবেশ বান্ধব এবং এর সাথে ভেষজ গুণ সম্পন্ন বিভিন্ন হার্বের সংমিশ্রণে হারবাল ডায়িং মিলে পোশাককে স্বাস্থ্যকর এবং রোগ প্রতিরোধী ও নিরাময়কারী করে তোলে। 

বিশ্বে আয়ুর্বেদিক সার্ভিসের বাজার বড় হচ্ছে। এর মার্কেট সাইজ ২০১৭ সালে ১,১৭০ মিলিয়ন ডলারের ছিল, যা ২০২৫ সাল নাগাদ ২,৮৫০ মিলিয়ন ডলারের বাজারে পরিণত হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে (orbisresearch.com)। এবং বর্তমানে ভারতের বিভিন্ন ফ্যাশন হাউজগুলো এই সুযোগটা নিতে চাচ্ছে আয়ুর্বস্ত্রকে কেন্দ্র করে বিশ্ব বাজারে জায়গা করে নেয়ার জন্য। 

কলকাতা বেইজড ফ্যাশন হাউজ রিতবস্ত্র তৈরি করছে হারবাল ডায়িং করা “আয়ুর শাড়ি”। 

আয়ুর্বস্ত্রের উপকারিতাঃ

  • আয়ুর্বস্ত্র ত্বকের অ্যালার্জি, চুলকানি, ফোস্কা পরা, রেশ ওঠা, অস্বস্তি বোধ ইত্যাদি বিরক্তিকর সমস্যা দূর করে আরামদায়ক অনুভূতি দেয়। 
  • অর্গানিক ফাইবারগুলোই আয়ুর্বস্ত্রে ব্যবহার করা হয়, অর্থাৎ তুলা, পাট এবং অন্যান্য উদ্ভিজ্জ যে সব সোর্স থেকে সংগ্রহীত সুতা দিয়ে আয়ুর্বস্ত্রের ফেব্রিক তৈরি হয়, সেগুলো উৎপাদনের সময় জমিতে কোনো প্রকার সার বা রাসায়নিক ব্যবহার করা হয় না। ফেব্রিকও হ্যান্ডলুম তাঁতে বোনা হয়। সম্পূর্ণ অর্গানিক এবং ন্যাচারাল ওয়েতে এগুলো উৎপাদন এবং তৈরির ফলে প্রকৃতিতে কার্বন নিঃসরণ কম হয়, এনার্জির ব্যবহার কম হয়, তাই কম গ্রীনহাউজ গ্যাস নিঃসৃত হয়। 
  • আয়ুর্বস্ত্রের জন্য অর্গানিক তুলা জেনেটিকালি মোডিফাইড তুলাবীজ থেকে চাষ করা হয় না। 
  • সম্পূর্ণ পরিবেশ বান্ধব পদ্ধতি অনুসরণ করায় শ্রমিকদের কোনো প্রকার স্বাস্থ্য ঝুঁকি থাকে না, পানি ও বিদ্যুৎ অপচয় রোধ হয়, বিষাক্ত গ্যাস বা ক্যামিকেল রিএকশন থেকে মুক্ত থাকা যায়। 
  • কঠোর পরীক্ষার মাধ্যমে নিকেল, সীসা, ফর্মালডিহাইড, অ্যামাইনস, কীটনাশক এবং ভারী ধাতুগুলোর মতো বিষাক্ত দূষণের অনুপস্থিতি নিশ্চিত করা হয়। 
  • যাদের ত্বকে অ্যালার্জির সমস্যা আছে, সিনথেটিক পোশাক পরতে পারেন না একদমই, তাদের জন্য অর্গানিক ফাইবারে তৈরি এসব ভেষজ পোশাক বা আয়ুর্বস্ত্র অনেক বেশি উপকারি। 
  • কীটনাশক জনিত স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে বেশি থাকে শিশুরা। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ লক্ষ শিশুরা মাত্র ৫ বছর বয়সে ক্যান্সার ঝুঁকি সৃষ্টিকারী কার্সিনোজেনিক কীটনাশক গ্রহণ করে তাদের সারাজীবনে গ্রহণ করা কীটনাশকের ৩৫%, বিভিন্ন খাদ্য, পানীয় এবং গৃ্হস্থালিতে ব্যবহৃত বিভিন্ন উপাদানের মাধ্যমে। এজন্যই অর্গানিক ফাইবার উৎপাদন এবং ভেষজ রং এ রঞ্জিত আয়ুর্বস্ত্র তৈরি ও ব্যবহার বৃদ্ধির মাধ্যমে এ ধরণের স্বাস্থ্যঝুঁকি হ্রাস করা সম্ভব অনেকাংশেই। 
  • প্রাকৃতিক উপায়ে অর্গানিক চাষ করায় মাটির উর্বরতা বৃদ্ধি করে।
  • অর্গানিক তুলা সহ অন্যান্য অর্গানিক ফাইবারে উৎপাদন ও চাহিদা বৃদ্ধি করছে। 
  • পানির অনেক সাশ্র‍য় হয়। ট্যাক্সটাইল ইন্ডাস্ট্রিতে পানির অপচয় নিয়ে বিশ্ব এখন শঙ্কিত। তুলা চাষ করতে প্রচুর পানির দরকার হয়। যে সব অঞ্চল পানি স্বল্পতায় ভোগে, তাদের জন্য তাই এটি অনেক ক্ষতিকর। তবে অর্গানিক উপায়ে তুলা চাষ জমির উপর ইতিবাচক প্রভাব ফেলে, মাটির অম্লতা হ্রাস করে, মাটির গঠন উন্নত করে, ক্ষয়রোধ করে এবং এভাবে অনেক ক্ষতি এড়ানো যায়। আর হারবাল ডায়িং এর জন্য ব্যবহৃত পানিও পুনঃব্যবহার করা যায় বলে অপচয় রোধ করা যায় অনেকখানি। 
  • কেঁচোকে বলা হয় প্রাকৃতিক লাঙল। অর্গানিক ফলনের ফলে মাটিতে এ ধরণের উপকারি জীব ও অনুজীবের বিকাশ ঘটে। ফলে ফলন ভালো হয়। 

হারবাল ট্যাক্সটাইল বা আয়ুর্বস্ত্র উৎপাদন প্রক্রিয়াঃ

হারবাল ট্যাক্সটাইল বা আয়ুর্বস্ত্র তৈরির পুরো প্রক্রিয়াই ১০০% অর্গানিক উপায়ে করা হয়। উদ্ভিজ্জ ট্যাক্সটাইল ফাইবার অর্গানিক উপায়ে চাষ করা, প্রাণিজ ফাইবারকে অর্গানিক উপায়ে প্রসেস করা, হ্যান্ডলুম তাঁতে ফেব্রিক তৈরি, ফাইবার বা ফেব্রিককে বিভিন্ন ভেষজ হার্বের নির্যাসে ডায়িং বা রং করা ইত্যাদি প্রত্যেকটা ধাপ সম্পন্ন হয় কোনো ধরনের ক্যামিকেলের ব্যবহার ছাড়া। 

হারবাল ডায়িং প্রসেসে রংহীন সুতা বা কাপড়কে রঙিন করে তুলতে কয়েকটি ধাপের মধ্য দিয়ে যেতে হয়। আয়ুর্বস্ত্র তৈরির জন্য সার্টিফাইড অর্গানিক কটন, ন্যাচারাল কটন, পাট, শণ, উল, লিনেন, সিল্ক ইত্যাদি ন্যাচারাল সুতা বা এদের মিশ্রণ ব্যবহার করা হয়। 

আয়ুর্বস্ত্র তৈরির বিভিন্ন ধাপ নিচে আলোচনা করা হলো- 

  1. Desizing:

বুনন করা ধূসর বা রংহীন কাপড়কে মিনারেল ওয়াটার বা প্রাকৃতিক খনিজ সমৃদ্ধ পানি এবং সামুদ্রিক লবনের মিশ্রণে ধোয়া হয় বুননের সময় ব্যবহৃত সাইজিং, তেল, আঠা বা মাড়ি অপসারণ করার জন্য। 

  1. Bleaching:

কাপড়ের ব্লিচিং এর জন্য প্রথমে একে সরাসরি সূর্যালোকের সংস্পর্শে এনে, এরপর একে বায়োডিগ্রেডেবল প্রাকৃতিক ভাবে প্রাপ্ত পরিষ্কারক এবং সার্ফেক্টেন্ট যেমন ফেনিলা বা রিঠা (Sapindus Mukorossi), সাপটালা (Acacia Sinuata) ইত্যাদি দিয়ে ব্লিচ করা হয়। 

  1. Mordanting:

কাপড়ের রং উজ্জ্বল এবং দৃঢ় করার জন্য  আয়ুর্বস্ত্র তৈরির এ পর্যায়ে এতে ন্যাচারাল মরড্যান্ট যেমন- হরিতকী, আমলকি, বয়ড়ার নির্যাস, রুবার্বের পাতা, তেল, খনিজ পদার্থ, ফিটকারী, সিনকোনার বাকল (Symplocos racemosa),  কেন্দুকা বা আবলুস বৃক্ষ (Diospyrose ebenum) ইত্যাদি ব্যবহার করা হয়। কিন্তু পরিবেশগত কারণে কপার বা তামা, ক্রোম, জিঙ্ক বা দস্তা, টিন ইত্যাদির মতো মর্ডান্টগুলো ব্যবহার করা হয় না। 

  1. Dyeing:

আয়ুর্বস্ত্র তৈরির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ধাপই হলো ডায়িং বা রং করা। কারণ এই ধাপেই রোগ প্রতিরোধী বা নিরাময়কারী বিভিন্ন উপাদানের মিশ্রণে অর্গানিক ইয়ার্ন বা ফেব্রিককে রঞ্জিত করা হয়। তাই খুব সতর্কতা এবং সাবধানতা অবলম্বন করা হয়। কাপড়টি যে ধরণের রোগ প্রতিরোধ বা নিরাময় করবে বা অসুস্থতার ট্রিটমেন্ট করবে, সেই অনুযায়ী খুব নিয়ন্ত্রিতভাবে ভেষজ বা ঔষধি গুণসম্পন্ন উপাদানগুলো মিশ্রিত করে কাপড়ের রং তৈরি করা হয়৷ 

বিভিন্ন প্রাকৃতিক উৎস থেকে প্রাপ্ত উপাদান যেমন – ফল, ফুল, বাকল, পাতা, শেকড়, খোসা ইত্যাদির মিশ্রণে খুব সাবধানে কাঙ্ক্ষিত রং প্রস্তুত করা হয়। 

ডাই এর মিশ্রণের তাপমাত্রা, ভেষজ উপাদানের সংখ্যা ও পরিমাণ, ফেব্রিকের রং শোষণের সময়কাল এবং পুরো প্রসেসে ব্যবহৃত অন্যান্য সরঞ্জামের সবকিছুই খুব  সাবধানে নিয়ন্ত্রণ করা হয়। 

ভেষজ উপাদানগুলো প্রাকৃতিক উপায়ে সরাসরি কাপড়ে প্রয়োগ করা হয়, যেন এর ঔষধি গুণাগুণ অক্ষুণ্ণ থাকে। 

লাল, হলুদ, বাদামী, কমলা, সবুজ ইত্যাদি সব ধরণের রং ও রং এর বিভিন্ন শেড এই ভেষজগুলির সাহায্যে প্রস্তুত করা যায়। 

এরপর এই মেডিকেটেড কাপড়কে ঠান্ডা করা হয়, বার বার ধোয়া হয় যেন বাড়তি কোনো কিছু এতে থেকে না যায় এবং ছায়ার মাঝেই এগুলোকে শুকানো হয়। 

  1. Finishing:

এভাবে হারবাল ডায়িং এর পর ফিনিশিং প্রক্রিয়াও সম্পূর্ণ অর্গানিক ভাবে সম্পন্ন হয়৷ কাপড়ে বিশুদ্ধ পানি ছিটিয়ে অ্যালোভেরা, ক্যাস্টর ওয়েল ইত্যাদি ব্যবহার করে হ্যান্ড রোলের মাধ্যমে চাপ প্রয়োগ করে টানটান করা হয়৷ 

  1. Recycling Residue:

আয়ুর্বস্ত্র তৈরির সার্বিক এই প্রসেসটি অর্গানিক। সিন্থেটিক ডায়িং এর মতো এর মাধ্যমে পরিবেশের কোনো দূষণ হয় না। এর পুরো প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সৃষ্ট কঠিন ও তরল বর্জ্য পরিশোধন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে আলাদা করা হয় এবং কৃষি জমিতে ব্যবহৃত হয় জৈব সার হিসেবে এবং সেচ কাজে। এছাড়াও বায়ুগ্যাসও তৈরি করা যায় এসব বর্জ্য থেকে। 

আয়ুর্বস্ত্রের ব্যবহারঃ

আয়ুর্বস্ত্র ব্যবহারের সবচেয়ে কার্যকরী সময় হচ্ছে যখন আমাদের শরীর বিশ্রামে থাকে যেমন- ঘুম বা মেডিকেশনের সময়। কারণ এই সময়গুলোতেই শরীর ন্যাচারালি হিলিং হয়, শারীরিক ভারসাম্য পুনঃ সংগঠিত হয়। ত্বক শরীরের সবচেয়ে বড় অর্গান বা অঙ্গ। এটি যেমন লোমকূমের মাধ্যমে দেহের অভ্যন্তরীণ বিষাক্ত উপাদান নিঃসৃত করে, তেমনি আবার বাইরে থেকেও বিভিন্ন পদার্থ ত্বকের মাধ্যমে দেহের ভেতর প্রবেশ করতে পারে। সাধারণ ভাবে তৈরি পোশাকে বিভিন্ন ক্ষতিকর রাসায়নিক ও টক্সিন থাকে, যা ত্বকের মাধ্যমে শরীরে মিশে যায়। অপরদিকে আয়ুর্বস্ত্র ক্যামিকেল ফ্রি উপাদানে তৈরি হওয়ায় এটি প্রাকৃতিক ভাবে ত্বককে শক্তিশালী করে এবং ক্ষতিকর রাসায়নিক ও বিষাক্ত পদার্থগুলোকে শরীরে প্রবেশ করতে বাধা দেয়। আর এর ভেষজ গুণ ত্বককে রোগ প্রতিরোধী করে তোলে। 

এটি মাথায় রেখেই হারবাল ট্যাক্সটাইলের মাধ্যমে এমন সব প্রয়োজনীয় ও নিত্য ব্যবহার্য জিনিস বেশি তৈরি করা হয়, যেগুলো বেশি সময় এবং বিশ্রামের সময়  মানুষের ত্বকের সংস্পর্শে থাকে। যেমন – বিছানার চাদর, অন্তর্বাস, তোয়ালে, মেডিটেশনের উপযোগী পোশাক, কম্বল, নাইট ড্রেস ইত্যাদিতে হারবাল ট্যাক্সটাইল ব্যবহার করা হয় এর ভেষজ গুণ ত্বকের মাধ্যমে ভালো ভাবে অনেক সময় ধরে শোষিত হওয়ার জন্য।  ভেষজ পোশাক তৈরির পদ্ধতিতে এখন কার্পেট, ম্যাট্রেস, পাপোস, নারিকেলের ছোবার ম্যাট ইত্যাদিও তৈরি করা হচ্ছে। এগুলো তৈরিতে প্রথমে ফাইবারগুলো ভেষজ রং এর মিশ্রনে ভিজিয়ে রাখা হয়, তারপর ম্যাটগুলো বোনা হয়। 

বিশ্ববাজারে আয়ুর্বস্ত্রঃ

আয়ুর্বস্ত্রের চাহিদা খুব ধীরে হলেও বাড়ছে। বিশেষ করে আয়ুর্বেদিক প্রাচীনকাল থেকে ভারতীয়দের চিকিৎসা, রূপচর্চা ও বস্ত্রের ক্ষেত্রে ব্যবহার হয়ে আসছে বলে ভারতে এর বাজার বর্তমানে ভালো ভাবেই বেড়ে উঠছে, উৎপাদন এবং চাহিদা বাড়ছে। পাশাপাশি বাংলাদেশেও কিন্তু আয়ুর্বেদিক এবং হারবালের চর্চা ও জনপ্রিয়তা কম নয়। তাই আমাদের দেশেও আয়ুর্বস্ত্রের ভালো একটা সম্ভাবনা তৈরির সুযোগ রয়েছে। 

আয়ুর্বস্ত্র শারীরিক উপকারিতার সাথে সম্পর্কিত এবং ইমিউন সিস্টেম শক্তিশালী করতে কার্যকরী হওয়ায় ভারতের বিভিন্ন আয়ুর্বেদিক ট্রিটমেন্ট সেন্টার থেকে তাদের রোগীদের সুস্থ জীবনযাপনের জন্য আয়ুর্বস্ত্র ব্যবহার করার জন্য পরামর্শ দিচ্ছে। আবার ভারতের হ্যান্ডলুম ওয়েভারস’ ডেভেলপমেন্ট সোসাইটিও আয়ুর্বেদিক ফেব্রিক ব্যবহার করে বিভিন্ন হোম ট্যাক্সটাইল তৈরি করছে। তারা বিভিন্ন আয়ুর্বস্ত্র যেমন- শাড়ি, বিছানার চাদর এবং অন্যান্য পোশাক সামগ্রী তৈরি করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইতালি, সিঙ্গাপুর, যুক্তরাজ্য, মালয়েশিয়া, জর্ডান, জার্মানি, তাইওয়ান ও সৌদি আরবে রপ্তানি করছে। এর ক্রমবর্ধমান চাহিদার কারণে কিছু অনলাইন শপও আয়ুর্বস্ত্র বিক্রি করতে শুরু করেছে। 

ভারতের রাজ্য সরকার এবং কেন্দ্রীয় মন্ত্রনালয়ও আয়ুর্বস্ত্রের প্রচার করছে। কারণ এটি হ্যান্ডলুম তাঁতশিল্পের চাহিদা বৃদ্ধি করবে এবং পরিবেশবান্ধব পোশাকের জন্যও একটি বিশেষ বাজার তৈরি করবে। 

আয়ুর্বস্ত্রের চ্যালেঞ্জঃ

এই আধুনিক প্রযুক্তির যুগে যে কোনো কিছুর জন্যই প্রকৃতি নির্ভরতা খুব সহজ ব্যাপার নয়। কারণ প্রকৃতি আমাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে। আবহাওয়া এবং ঋতুর পরিবর্তনের সাথে অনেক কিছু নির্ভর করে। আয়ুর্বস্ত্র তৈরিতে যেমন সম্পূর্ণ প্রাচীন ও প্রাকৃতিক পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়, তাই এটি সূর্যালোকের উপর নির্ভর করে, অন্যান্য প্রাকৃতিক উপাদানের উপর নির্ভর করে যা প্রকৃতির পরিবর্তনের সাথে পরিবর্তিত হয়। 

আবার প্রাকৃতিক এবং আয়ুর্বেদিক রং তৈরির ক্ষেত্রেও সীমাবদ্ধতা রয়েছে, কারণ সব রং এর সব ধরনের শেড এসব উপাদান দ্বারা তৈরি করা সম্ভব হয় না এবং এর কিছু রং সূর্যের আলোতে বিবর্ণ হয়ে যায় সহজেই। 

পোশাক শিল্পের সাথে জড়িত যারা, উৎপাদনকারী যারা তারাও সিন্থেটিক ডায়িং পদ্ধতি থেকে খুব সহজে ন্যাচারাল বা হারবাল ডায়িং পদ্ধতিতে মুভ করার সিদ্ধান্ত নিবে না। কারণ এটি সম্পূর্ণ নির্ভর করে ক্রেতা চাহিদার উপর। এই খাতে ক্রেতা চাহিদা বৃদ্ধিই বিশাল চ্যালেঞ্জ। ক্রেতাদের চাহিদাই শুধু পরিবেশ বান্ধব এবং স্বাস্থ্যকর একটা পদ্ধতি হিশেবে আয়ুর্বস্ত্রকে পোশাক খাতের একটি শাখায় অন্তর্ভুক্ত করতে পারে। 

বাংলাদেশে আয়ুর্বস্ত্রের সম্ভাবনাঃ

আয়ুর্বস্ত্রের জন্ম প্রাচীন ভারতে। আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ হওয়ায় ইতিহাস, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যগত দিক থেকে বাংলাদেশ ভারতের পারস্পরিক সম্পর্ক বেশ গভীর। বাংলাদেশে হারবাল বা ভেষজ জিনিসের চর্চা, ব্যবহার ও চাহিদা তাই অনেক প্রাচীনকাল থেকেই ছিল এবং এখনো আছে। তবে এটি আজ অব্দি বস্ত্র খাতে পৌঁছাতে পারেনি। তাই এদিকে নতুন এক বিবর্তনের সুযোগ এবং সম্ভাবনা রয়েছে। 

বাংলাদেশ কৃষিপ্রধান দেশ হওয়ায় ভেষজ যে সব উদ্ভিদ আয়ুর্বস্ত্রের ডায়িং এবং বিভিন্ন প্রসেসে ব্যবহৃত হয়, সেগুলো এদেশেও প্রচুর পরিমাণে উৎপাদন সম্ভব। আর যদি প্রচুর কাঁচামাল আয়ুর্বস্ত্রের জন্য তৈরি করা সম্ভব হয়, তবে তা সহজলভ্য এবং সহজপ্রাপ্য হবে যা আয়ুর্বস্ত্রকে সাধারণের ক্রয়ক্ষমতার মাঝে রাখতে সাহায্য করবে। 

আমাদের দেশে আয়ুর্বস্ত্র তৈরি এবং এর জন্য বাজার তৈরিতে সবচেয়ে বেশি যা যা প্রয়োজন তা হলো- সরকারি বেসরকারি পৃষ্ঠপোষকতা, পর্যাপ্ত গবেষণা এবং সাধারণের মাঝে একে পৌঁছে দিতে ঠিক ভাবে প্রমোশন করা।

গবেষণা দরকার আমাদের দেশের নিজস্ব সম্পদ কাজে লাগিয়ে আয়ুর্বস্ত্র কীভাবে উৎপাদন করা যায়, সেই দিকগুলো খুঁজে বের করার জন্য। আর সরকারি বেসরকারি পৃষ্ঠপোষকতা দরকার পোশাক শিল্পের অন্যান্য খাতের সাথে প্রতিযোগিতায় একে টিকে থাকার উপযোগী করে তোলার জন্য। আর অবশ্যই চাহিদা তৈরির জন্য একে সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে হবে, তাদের মনে এর বিশেষত্ব ঢুকিয়ে দিতে হবে। 

আয়ুর্বস্ত্রের প্রচারের জন্য সোসাল মিডিয়া তথা ফেইসবুক সবচেয়ে সহজ মাধ্যম। শুধু দরকার এদিকে কিছু ডেডিকেটেড মানুষ, যারা দিন রাত লাভ ক্ষতির চিন্তা না করে আয়ুর্বস্ত্র নিয়ে লিখে যাবে, বিভিন্ন কন্টেন্ট তৈরি করবে এবং ফেইসবুক ও অনলাইন মিডিয়ায় প্রচার করবে। 

যেহেতু আমাদের দেশে ভেজিটেবল ডাই এর পোশাকের একটা বাজার আছে, তাই আয়ুর্বস্ত্রের চাহিদা তৈরিও সম্ভব। আর অবশ্যই এক সময় বিশ্ব বাজারেও রপ্তানি করার সুযোগ তৈরি করবে আয়ুর্বস্ত্র এদেশে উৎপাদন করার উদ্যোগ গ্রহণ করা সম্ভব হলে। আর আমাদের দেশি পণ্যের ই-কমার্স এর কমিউনিটি রয়েছে, ই-কমার্স ডেভেলপমেন্ট সেন্টার রয়েছে দেশি পণ্যের গবেষণা ও প্রচার রিলেটেড কাজ করার জন্য। তাই এটি নিঃসন্দেহে আমাদের জন্য একটি নতুন এবং বড় সুযোগ। 

আরেকটা ব্যাপার হচ্ছে, আয়ুর্বস্ত্রের বাজার তৈরি হতে পারে বাচ্চাদের পোশাক ও ফ্যাশনকে কেন্দ্র করে। কারণ বাচ্চারা সেনসেটিভ ত্বকের অধিকারী হয়, তাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাও কম হওয়ায় বিভিন্ন ভাইরাস ব্যাকটেরিয়ার আক্রমণের সম্ভাবনা শিশু অবস্থায় বেশি থাকে, তাই অনেক বাচ্চাদেরই স্কিন প্রব্লেম সহ বিভিন্ন ভাইরাস ব্যাকটেরিয়া জাতীয় রোগ হয়। আয়ুর্বস্ত্র এক্ষেত্রে বাচ্চাদের কিউরের জন্য, আরামের জন্য খুব ভালো একটা সমাধান হতে পারে৷ মা- বাবাও কিন্তু বাচ্চাদের আরামদায়ক পোশাকের ক্ষেত্রে তাই বেশি গুরুত্ব দিয়ে থাকে। সিন্থেটিক পোশাক বাচ্চাদের ব্যবহারের জন্য অনেক বেশি ক্ষতিকর হতে পারে। তাই বাচ্চাদের পোশাককে প্রায়োরিটি দেয়া হলে আয়ুর্বস্ত্রের বাজার আরও দ্রুত মার্কেট ক্যাপচার করতে পারবে বলে আশা করা যায়। 

উপসংহারঃ

আয়ুর্বস্ত্র বডি সিস্টেমের ব্যালেন্স বা ভারসাম্য রক্ষা ও পুনরুদ্ধার করতে এবং ইমিউন সিস্টেমকে শক্তিশালী করতে বেশ কার্যকরী৷ পরীক্ষিত অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল ও বিভিন্ন ঔষধি গুণসম্পন্ন ভেষজ ম্যাটেরিয়াল এতে ব্যবহার করা হয়। তাই এগুলো পরিধানে ও ব্যবহারে শরীর উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ, আর্থ্রাইটিস, হাঁপানি, ডায়াবেটিস ইত্যাদির মতো রোগের মোকাবিলা করতে সক্ষম হবে বলে আশা করা যাচ্ছে। 

আয়ুর্বস্ত্র তৈরিতে যে সব বর্জ্য উৎপন্ন হয় সেগুলোও পুনঃ ব্যবহারের মাধ্যমে জমির উর্বরতা বৃদ্ধি করা যায়। তাই সর্বোপরি এটি এমন একটি অর্গানিক পদ্ধতি, যা আমাদের আত্মার শান্তিতে ভূমিকা রাখে। পরিবেশ বান্ধব এবং স্বাস্থ্য সচেতনতার এই যুগে আমাদের দেশ ও বিশ্ব বাজারে আয়ুর্বস্ত্রের চাহিদা ও জনপ্রিয়তা বৃদ্ধির বিশাল সুযোগ রয়েছে এমনটা নির্দ্বিধায় বলা যায়। 

References:

খাতুনে জান্নাত আশা
This is Khatun-A-Jannat Asha from Mymensingh, Bangladesh. I am entrepreneur and also a media activist. This is my personal blog website. I am an curious woman who always seek for new knowledge & love to spread it through the writing. That’s why I’ve started this blog. I’ll write here sharing about the knowledge I’ve gained in my life. And main focus of my writing is about E-commerce, Business, Education, Research, Literature, My country & its tradition.
https://khjasha.com

Leave a Reply

Top